কীটনাশকের ইতিকথা
কীটনাশকের ইতিকথা; - ডাঃ পার্থপ্রতিম; ডিসেম্বর ১৯৮৯; ৪২তম বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা; জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত
মানুষের সঙ্গে বহু পতঙ্গেরই পরিচয় সুখের নয়। একদিকে মশা-মাছি যেমন রোগের জীবাণু বহন করে, অন্যদিকে নানাজাতের পোকা আমাদের খাদ্যশস্যের উপর আক্রমণ চালায়। এয়োদশ শতাব্দীতে নীল উপত্যকার শস্যক্ষেত পঙ্গপালের (Locust) দ্বারা নিঃশোষিত হয়, যার নাটকীয় বর্ণনা বাইবেলে আছে। সেই কারণে বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পতঙ্গ দমনে সচেষ্ট হয়েছে।
নিওলিথিক কালেও ( প্রায় ৭০০০ খৃঃ পূঃ ) চাষ-আবাদের জন্য মানুষ উচ্চ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন গাছের বীজ সংগ্রহ করত। রোমান লেখক প্লিনি (Pliny) সর্বপ্রথম তাঁর ‘ন্যাচারাল হিষ্ট্রি’ বইতে কীট-পতঙ্গ দমনের উপায় বর্ণনা করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর আগে পতঙ্গ দমনের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হত না। পতঙ্গ-দমন অভিযান প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্যলাভও করে ১৮৪০ খৃষ্টাব্দে ইউরোপে Vine sowdery mildew (Uncilena necator) প্রয়োগ করে। তার আগে একাজে ব্যবহার করা হত গন্ধকের গুঁড়ো (Lime sulfur) ১৮৪৫ খৃষ্টাব্দে আয়ারল্যান্ডে মারাত্মকভাবে আলুর ক্ষয়রোগ দেখা দেয়। সেই সঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকায় শস্যখাদক পতঙ্গ (Corn borer) ও যাযাবর মথ (Gypsy moth) প্রবল আক্রমণ চালায়, ফলে দুর্ভিক্ষ হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পতঙ্গবিদ্যায় (Entomology) প্রথম বই ‘ফার্ম ইনসেক্ট’ লেখেন জন কার্টিস; প্রকাশিত হয় ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে। কার্টিস-ই প্রথম লেখক যিনি পতঙ্গ দ্বারা ক্ষতির অর্থনৈতিক পরিমাণ সম্বন্ধে আলোচনা করেন এবং পতঙ্গ প্রতিরোধের আহ্বান জানান।
১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে আলুর ক্ষেত ধ্বংসকারী কলোরাডো বিটল (Tegtinotarsa decemlineata) দমনের জন্য যুক্তরাজ্যের চাষীরা জলে অদ্রাব্য কীটনাশক-প্যারিস গ্রীন ( কপার অ্যাসিটো-আর্সিনেট), ক্যালসিয়াম আর্সিনেট (Calcium aesenate) ব্যবহার করেন। আর্সেনিক যুক্ত কীটনাশকের কার্যক্ষমতা নির্ভর করে ধাতব আর্সেনিকের (Metalic arsenic) পরিমাণের উপর। লেড আর্সিনেট প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে। দেখা গিয়েছিল, যেসব পোকা গাছের পাতা ও কান্ড খেয়ে পেলে তাদের পাকস্থলীতে এটি বিষক্রিয়া ঘটায়। ক্যালসিয়াম আর্সিনেট তুলো গাছের পোকা ধ্বংসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। অতিরিক্ত পরিমাণ আর্সেনিক যুক্ত যৌগ কিন্তু আবার গাছের ক্ষতি করে। এ ব্যপারে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্যারিসগ্রীন, তারপর ক্যালসিয়াম আর্সিনেট। লেড আর্সিনেট মোটামুটি নিরাপদ। বিভিন্ন কীটনাশক নানাভাবে কাজ করে।
বিভিন্ন কীটনাশক নানাভাবে কাজ করে। যেমন পাকস্থলীতে বিষক্রিয়া (Stomach poisoning) সংস্পর্শে বিষক্রিয়া (Contact poisoning) সুসমঞ্জস বিষক্রিয়া (Systemic poisoning) পতঙ্গের বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রক (Insect growth regulators) বাড়তি বিষক্রিয়া (Residual poisoning), ধোঁয়া সৃষ্টিকারী, পতঙ্গ বিতাড়ক, পতঙ্গ আকর্ষী (Attractants) প্রভৃতি।
১৮৭০ খৃষ্টাব্দে ফাইলোক্সিরা (Phylloxera) নামক গাছের কচি কান্ডের রসশোধনকারী পোকার ডিম নষ্ট করার কাজে টার অয়েল ও নিকোটিন সাফল্য লাভ করেছিল। লক্ষ্য করার বিষয় হল ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে সব কীটনাশক ছিল সহজ লভ্য, তাই অনেক ক্ষেত্রেই কীটনাশকের পাশাপাশি অন্যান্য পতঙ্গদমন পদ্ধতিও ব্যবহৃত হত। ‘লেডি বর্ড বিটল’ কে অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্যালিফর্নিয়াতে আমদানী করা হয় লেবু গাছের অ্যাফিড পোকা দমনের জন্য। ফাইলোক্সিরা-র কবল থেকে রক্ষা করার জন্য ইউরোপীয়ান আঙ্গুর গাছকে আমেরিকান আঙ্গুর গাছের কান্ডের সঙ্গে জোড় কলম (Grafting) করা হয়। ১৯৪২ খৃষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের ডাঃ পল মিলার ক্লোরিনযুক্ত জৈব যৌগে কীটনাশক ধর্ম আবিষ্কার করেন, যদিও ‘ডাইক্লোরো ডাইফিনাইল ট্রাইক্লোরোইথেন (DDT), ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে প্রথম সংশ্লেষিত হয়। মিলার এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। প্রথম দিকে পোকামাকড়ের হাত থেকে জামাকাপড়কে রক্ষা করার জন্য DDT ব্যবহার করা হত। দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় মশা-মাছির হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সেনাবাহিনীতে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়। নেপেলস্-এর টাইফ্যাস রোগের মহামারী ডি.ডি.টি প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণে আসে। মিলারের আবিস্কার কীটনাশক আবিষ্কারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল ক্লোরডেন ও মিথোক্সিক্লোর আবিষ্কৃত হয় ১৯৪৫ খৃস্টাব্দে, তারপর ১৯৮৪-এ হেপ্টাক্লোর, অলড্রিন ও টেক্সাফেন এবং ১৯৫১ এনড্রিন। পরবর্তীকালে ডিলেন, কেপোন, পারথেন, এন্ডো-সালফান, ডাই অলড্রিন, লিনডেন প্রভৃতি অর্গানো-ক্লোরিক কীটনাশক আবিষ্কৃত হয়।
১৯৭৬ খৃষ্টাব্দে বিভিন্ন কীটনাশকের মধ্যে টেক্সোফেন বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। তুলোগাছের পোকা ধ্বংসের কাজে এটি সাফল্যলাভ করেছিল। মিথোক্সিক্লোর ব্যবহার কার হত গবাদিপশুকে কীটপতঙ্গের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যও ফুলের বাগানে। হেপ্টাক্লোর, অলড্রিন, ডাই অলড্রিন ব্যবহৃত হত উই ও অন্যান্য মাটিতে বসবাসকারী পোকা মারার ক্ষেত্রে। কেপোন আরশোলা ও জামাকাপড়-বইয়ের পোকা দমনের জন্য প্রয়োগ করা হত। তবে, সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত কীটনাশক হল ডি.ডি.টি.।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীতে বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। সেই সময় কীটনাশক হিসাবে বিভিন্ন অর্গানোফসফরাস যৌগ আবিষ্কৃত হয়। এইসব কীটনাশক সুসমঞ্জস্য বিষক্রিয়া ঘটায়। অর্থাৎ পতঙ্গের সরাসরি কোন ক্ষতি করে না। কিন্তু উদ্ভিদদেহে প্রবেশ করার পর বিভিন্ন রকম উৎসেচকের (Enzyne) সংশ্লেষ ঘটায় ; যে সব উৎসেচক পতঙ্গদেহে বিষক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। যে সকল পোকা গাছের পাতা বা কান্ড খেয়ে থাকে কিংবা মুকুলের রস শোষণ করে তারা অর্গানো-ফসফরাস কীটনাশক প্রয়োগে মারা যায়। কিন্তু যারা গাছের ক্ষতি করে না, তাদের উপর এই কীটনাশকের কোন বিষক্রিয়া নেই। এই শ্রেণীর প্রথম সংশ্লেষিত যৌগ হল ‘অকটোমিথাইল পাইরোফসফরাইভ’ যার বাণিজ্যিক নাম সেরাডান (Sehradan)। অর্গানোফসফরাস যৌগের কার্য-ক্ষমতা অনেক বেশি ও দাম কম হওয়ার জন্য এর বহুল ব্যবহার শুরু হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ডাই ইথাইল-পি-নাইট্রোফিনাইল মনোথিও ফসফেট’ সাধারণভাবে যাকে বলা হয় প্যারাথিয়ন (Parathion)। সেরাডানের দ্বারা পরিবেশ দূষিত হয় বলে ১৯৭৬ খৃষ্টাব্দে আমেরিকা যুক্তরাষ্টের সেরাডান প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫০ এর মাঝামাঝি সময়ে কীটনাশক হিসাবে অর্গানোকার্বামেট যৌগের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছিল। প্রথম উৎপাদিত হয় ‘ন্যাপথাইল মিথাইল কার্বামেট’, সাধারণভাবে কারবারিল (Carbaryl)। কার্বামেট যৌগেরাও সুসমঞ্জস বিষক্রিয়া ঘটায়। উল্লেখযোগ্য কার্বামেট কীটনাশক হলো অলডিকার্ব, কার্বোফুরান, মিথোমিল, অক্সামিল, পিরিমিকার্ব প্রভৃতি।
১৯৫১তে কীটপতঙ্গ দমনের সমস্যা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল ডি.ডি.টি. প্যারাথিয়ন প্রভৃতি কীটনাশক প্রচলিত মাত্রায় প্রয়োগ করে কার্যকরী হল না। তাই প্রয়োগমাত্রা দুই থেকে তিন গুণ বাড়ানো হল। ১৯৬২ তে র্যাসেল কারসন তাঁর ‘সাইলেন্ট স্প্রিং (Silent Spring), বইতে রাসায়নিক কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ভয়াবহতা সম্বন্ধে আলোচনা করেন। ‘জৈবরাসায়নিক কীটনাশক মাত্রই সকল জীবের ও পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর’- একথা আজ প্রমাণিত সত্য।
বর্তমানে ফলিত পতঙ্গবিদ-রা (Applied Entomologist) প্রাকৃতিক কীটনাশক (Natural Insecticide) যেমন নিমতেল, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ (Biological), ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রভৃতি পদ্ধতি প্রয়োগে সচেষ্ট হয়েছেন। আশা করা যায় যে, অদূর ভবিষ্যতে এইসব পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে কীটপতঙ্গ দমন সহজসাধ্য হবে এবং পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।







No comments