অক্লান্ত নায়ক
অক্লান্ত নায়ক; ডাঃ পার্থপ্রতিম। ১১ই এপ্রিল ২০০৪; রবিবারের সাময়িকী; উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত
বাজছে ভোটের ঘন্টা। চটক নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি, আর প্রতিশ্রুতি পালনের
প্রতিশ্রুতি শুনে গণজনতার কান-মাথা ভোঁ ভোঁ। কাজ না করার অজুহাতের ভারে
জনমানসের দেহ-মন যখন ভারাক্রান্ত, তখন এই ধরিত্রীর একজন চলতে না পারা, বলতে
না পারা মানুষ স্পিচ সিন্থেসাইজারের বোতাম টিপে টিপে জানিয়েছেন- আমার অনেক
অ-নে-ক কিছু করার আছে। সেই ‘অক্লান্ত নায়ক’-কে নিয়েই এবারে আপনাদের সামনে
হাজির -ডাঃ পার্থপ্রতিম।
"আমি লক্ষ করলাম চলাফেরায় আমি জবুথবু হয়ে যাচ্ছি। এক দু-বার বিনা কারণে
পড়েও গেলাম। আমি এমন একটা রোগে ভুগছি যেটা সারবে না এবং কয়েক বছরের ভেতরেই
আমার মৃত্যু হবে। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখন আমার উল্টোদিকের বিছানায়
একটি ছেলে দীর্ঘদিন ভুগে ভুগে মারা গেল। আমি আবছা আবছা বুঝতে পেরেছিলাম,
রোগটি ছিল লিউকোমিয়া। দৃশ্যটা সুন্দর মনে আছে। যদি কখনো আমার নিজের জন্য
দুঃখ করতে ইচ্ছা করে, তখন আমি ওই ছেলেটির কথাই ভাবি।"
১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে বার্মিংহামে ব্রিটিশ মোটর নিউরোন ডিজিজ
অ্যাসোসিয়েশনের একটি কনফারেন্সে এভাবেই নিজের অনুভূতি বলছিলেন হকিং সাহেব।
পুরো নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর মৃত্যুর তিনশো
বছর পূর্তির দিনে ৮ ই জানুয়ারী ১৯৪২-এ ধরার বুকে ধরা দিয়েছিলেন এই
মানুষটি। না, দিনটির তেমন কোন মহত্ত্ব নেই। ঘটনাটি কাকতলীয় কারণ সেদিন
প্রায় দু-লক্ষ শিশু জন্মেছিল এই জগৎ জুড়ে। তবে তার মধ্যে অধ্যাপক হকিং
হয়েছেন একজনই, হয়ও তাই। আপামর জনসাধারণের নয়; ইতিহাস বইয়ের পাতা বরাদ্দ হয়
স্বল্পসংখ্যক মানুষের জন্য। অপ্রিয় হলেও, এটাই সত্য।
স্টিফেনের বাবা-মা দুজনেই লন্ডনে থাকতেন। কিন্তু স্টিফেন জন্মেছিলেন
অক্সফোর্ডে। কারণ সে সময় অক্সর্ফোড জায়গাটি ছিল নবজাতকের পক্ষে নিরাপদ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের সঙ্গে মোটামুটি একটা অলিখিত চুক্তি
ছিল, তারা ঐতিহ্যমন্ডিত অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে বোমা ফেলবে না। তার বদলে
ব্রিটিশ বৈমানিকরা অক্ষত রাখবে হাইডেলবার্গ ও গটিংগেন নগর দুটিকে। তাই সে
সময় বহু সন্তানসম্ভবা মা-বাবারা আশ্রয় নিতেন এই জায়গাগুলিতে।
হকিং-এর বাবা ডাঃ ফ্র্যাঙ্ক হকিং ছিলেন চিকিৎসক। অক্সফোর্ডে তিনি চিকিৎসা
বিজ্ঞানের পাঠ নেন। ট্রপিক্যাল ডিজিজ-এর ওপর গবেষণার কাজে পূর্ব আফ্রিকাতেও
কিছুদিন ছিলেন। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কোনোক্রমে ইংল্যান্ডে
ফিরে আসেন। হকিং-এর মা ইসোবেল-এর শিক্ষার পাঠও এই অক্সফোর্ড নগরে। অনেকরকম
কাজ করে শেষে সেক্রেটারির চাকরিতে যোগ দেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথমদিকে
ফ্র্যাঙ্ক-এর সঙ্গে ইসোবেলের আলাপ। তারপর ভাব-ভালোবাসা ও পরিণয়। হকিং
মা-বাবার প্রথম সন্তান। স্টিফেন-এর বোন মেরি তাঁর থেকে ১৮ মাসের ছোটো।
শৈশবে মেরির সঙ্গে ভাব-আড়ির মধ্য দিয়ে হকিং বড়ো হয়ে ওঠেন। স্টিফেনের যখন
পাঁচ বছর তখন তাঁর ছোটবোন ফিলিপ্পা-র জন্ম হয়। ভাই এডওয়োর্ডের জন্ম আরো
অনেক পরে।
উত্তর লন্ডনের হাইগেট অঞ্চলে স্টিফেনের শৈশব কাটে। সেখানকার বায়রন হাউস
নার্সারি স্কুলে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি। তখন তাঁর বয়স চার। ছোটবেলায়
পড়াশোনায় তেমন মনযোগী ছিলেন না স্টিফেন। না থাকারই কথা। ইতিহাস বলে কৌতূহলী
দুষ্টু শিশুরা এমনি হয়। ওদেশের আইনস্টাইন, টমাস আলভা এডিশন থেকে এদেশের
রবীন্দ্রনাথ। মগজের যন্ত্রে যাদের নতুন নতুন কিছু করার নেশা। স্কুলের
পাঠ্যবই থেকে বাবার দেওয়া খেলনা রেলগাড়িটাই তার মনোযোগের বিষয় ছিল। মনের
মাঝে প্রশ্ন ছিল, রেলগাড়ি স্প্রিংয়ের দম দেওয়া স্থিতিশক্তি থেকে কিভাবে
গাড়িটা চলছে? হ্যাঁ, এটাই সুরুয়াৎ। এই জিজ্ঞাসাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল
মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনের কাজে। মনের মাঝে ভিড় জমাচ্ছিল হাজারো
প্রশ্ন। কোন শক্তিবলে পৃথিবী-গ্রহ-নক্ষত্র পাক মারে সূর্যের চারপাশে?
কীভাবেই বা সৃষ্টি হল এই রাতের তারা-দিনের রবি? আঁধার-আলোয় লুকিয়ে থাকা সকল
ছবি তাঁর মনের পটে দাগ কেটে যেত। মহাকাশ বিজ্ঞানের আকাশে স্টেফেন ডব্লু
হকিং আজ উজ্জলতম তারকা।
স্টিফেনের বয়স যখন ১০, বাবা চাইছিলেন তাঁর ছেলেকে লন্ডনের সম্ভ্রান্ত
পাবলিক স্কুলে ওয়েস্ট মিনিস্টারে ভর্তি করতে। কিন্তু স্কলারশিপ পরীক্ষায় ফল
খারাপ হওয়ার জন্য তিনি রয়ে গেলেন সেন্ট অ্যালবান্স স্কুলেই। তখনকার দিনে
ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল খুবই শ্রেণী বিভক্ত। স্কুলগুলিতে লেবেল
দেওয়া হত- এই স্কুলগুলি ভালো ছাত্রদের জন্য, এগুলি নয়। এছাড়াও প্রতিটি
ক্লাসে থাকত তিনটি করে শ্রেণী এ, বি ও সি। ‘এ’ সেকশনে যারা থাকত তাদের
জন্যই শুধু উচ্চশিক্ষার রাস্তা খোলা। বি ও সি কক্ষের ছাত্রদের যেতে হতো
কারিগরি বা অন্য কোনো অকুলীন কাজে। প্রথম এক থেকে কুড়ি জন স্থান পেত ‘এ’
সেকশনে। স্টিফেন কোনোমতে কান ঘেঁসে রয়ে গিয়েছিলেন ‘এ’ সেকশনে। ছ-সাতজন
ঘনিষ্ট বন্ধুদের মধ্যে চলত বিভিন্ন আড্ডা। যার বেশিরভাগ জুড়ে ছিল
আবোল-তাবোল বিষয়। কখনো ভূত-প্রেত, প্যারাসাইকোলজি, ধর্ম, কখনো বা
পদার্থবিদ্যার জটিল তত্ত্ব।
১৭ বছর বয়সে সেন্ট অ্যালবান্স স্কুল ছাড়েন। তার আগেই গণিতের ওপর তাঁর
প্রবল আগ্রহ জন্মে। স্কুলের গণিত শিক্ষক মিস্টার তাহতা অঙ্কটিকে একেবারে
জলভাত করে বোঝাতেন। জ্যামিতির উপপাদ্যগুলি শেখাতেন মজার গল্পচ্ছলে।
বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে ডাক্তারি বা রসায়নবিদ্যা নিয়ে পডুক। কারণ ফ্র্যাঙ্ক
জানতেন গণিত নিয়ে পড়লে মাস্টারি ছাড়া কোনো চাকরি নেই। সারাজীবন ছাত্র
ঠেঙানো, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। চেষ্টাও কম করেননি। স্টিফেনকে নিয়ে তিনি তাঁর
মিলহিল ল্যাবরেটারিতে যেতেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখাতেন
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট-প্রাণীদের চলনবলন। কাচের বাক্সে রাখা বিভিন্ন
পোকামাকড়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যোগসুত্রটা কোথায়? তাও ছেলেকে বোঝানোর
চেষ্টা করতেন। এসব যে স্টিফেনের খারাপ লাগত তা নয়, তবে মন যার পড়ে আছে
বিপুল সুদূর পানে তার কি পার্থিব পোকামাকড় তেমন মন টানে? তাই গণিত ও
পদার্থবিদ্যা তাঁর প্রথম পছন্দ।
১৯৫৯ সালের মার্চ মাসে স্টিফেন তৈরি হতে থাকলেন অক্সফোর্ডের প্রবেশিকা
পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা দিয়ে তিনি ভেবেছিলেন এখানে পড়া তার হল না।
প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারেরা অন্যসব ছাত্রদের
সঙ্গে আলাপ পরিচয় করলেও, স্টিফেনকে তেমন পাত্তা দিলেন না। মন হতাশ করে বাড়ি
ফিরে আসার ক-দিন পর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে টেলিগ্রাম এল তিনি
স্কলারশিপ পেয়েছেন।
অক্সফোর্ড পদার্থবিদ্যার ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার আগেই দিন হকিং অসুস্থ হয়ে
পড়েন। স্বভাবতই ফল আশানুরূপ হয়নি। প্রথম শ্রেণি না দ্বিতীয় শ্রেণির ডিগ্রি
তাঁকে দেওয়া হবে তার জন্য ইন্টারভিউতে পরীক্ষকেরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক
প্রশ্ন করলেন। জানতে চাওয়া হল তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। গবেষণা যদি করেন তবে
তার বিষয় কি হবে? স্টিফেন বললেন, তিনি মাথা ঘামাতে আগ্রহী দুটি বিষয়ে। এক
হল মহাবিশ্ব তত্ত্ব অর্থাৎ অতি বৃহৎ বা অসীমকে নিয়ে, আর দুই হল মৌলকণা
অর্থাৎ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে। তবে প্রথম পছন্দ মহাবিশ্বের মহাকাশ। অনেক
ভেবেচিন্তে পরীক্ষকেরা তাঁকে প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রিই দিলেন। না, তারা ভুল
করেননি। বর্তমানে বহু বিজ্ঞানীই বলেছেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের পর
মহাকর্ষতত্ত্বের গবেষণায় স্টিফেন হকিং-এর অবদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাবিশ্ব নিয়ে কেউ গবেষণা করতেন না।
কিন্তু কেমব্রিজ ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল। জগৎ জোড়া তাঁর
নামডাক। হকিং কেমব্রিজে গবেষণার জন্য দরখাস্ত করলেন। সম্মতি এল, খুসিতে
ডগমগ। কিন্তু মন আনারস করে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছোনোর পর হরষে বিষাদ। না, ফ্রেড
হয়েল-এর তত্ত্বাবধানে নয়। তাঁকে গবেষণা করতে হবে ডেনিস স্কিয়ামা নামের এক
অনামি বিজ্ঞানীর কাছে। কিছুদিন কাজ করার পর হকিং বুঝতে পারলেন তাঁর শাপে বর
হয়েছে। কারণ প্রফেসার হয়েল বছরের বেশিরভাগ সময়েই বাইরে বাইরে কাটান। সভা,
সমাবেশ, সেমিনার প্রায় লেগেই থাকে। ছাত্রদের তেমন সময় দিতে পারেন না। তাঁর
তত্ত্বাবধানে থাকা ছাত্ররা গবেষণার কাজে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। সে তুলনায়
স্কিয়ামা সবসময় ছাত্রদের সঙ্গে থাকেন, উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগান। গবেষণার কাজে
হকিং তরতরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন।
না, যাত্রাপথ এত মসৃণ হলে আজ আর তাঁকে নিয়ে বড়ো প্রবন্ধ লেখার প্রয়োজন
হতো না। শনিঠাকুর দাঁড়িয়েছিলেন অদূরেই। অক্সফোর্ডের শেষ বছর থেকেই এর
সুরুয়াৎ। লক্ষ করলেন চলাফেরায় কেমন জবরজং হয়ে পড়ছেন। হাত-পা মাঝে মাঝেই
অসাড় হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটি মা-বাবারও নজরে এল। ডাক্তারবাবুর
জ্যেষ্ঠপুত্রের চিকিৎসার কোনো ত্রুটি ছিল না। নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হল।
শিরদাঁড়ার এক্স-রে, মাংসপেশীর বায়পসি, রক্ত-প্রস্রাব আরো কত কী। তবে
সঠিকভাবে রোগ কেউ ধরতে পারলো না। চিকিৎসকেরা হতাশ হয়ে জানিয়ে দিলেন রোগ
হিসেবে এটি ব্যতিক্রমী। কিছু ভিটামিন লিখে দিলেন প্রেসক্রিপশনে। কেমব্রিজে
পৌঁছোনোর কিছুদিন পর জানা গেল স্টিফেনের রোগটি কী। নাম অ্যামাইওট্রপিক
ল্যাটারাল স্কেলেরোসিস সংক্ষেপে এ. এল. এস অন্যভাবে একে মোটর নিউরোন ডিজিজ
বলে। আমেরিকায় এ ব্যাধির নাম লু গেরিগের ডিজিজ। তখন তাঁর বাইশ বছর বয়স।
ডাক্তারবাবু কপালে ভাঁজ ফেলে বলে দিলেন দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকেই যাবে।
শমন বেশি দূরে নেই। বড়ো জোর দু-তিন বছর।
ফিরে এলেন আবার সেই গবেষণার কাজে। তখন বিশিষ্ট অপেক্ষবাদ ও মহাবিশ্ব
নিয়ে গবেষণা সবে শুরু হয়েছে। মনে হতে লাগল পি এইচ ডি শেষ করার মতো ততদিন
বেঁচে নাও থাকতে পারেন। নিজেকে কোনো এক ট্র্যাজিডি নাটকের নায়ক মনে হতে
লাগল। গ্রামোফোন চালিয়ে ওয়াগনারের সেই বিখ্যাত রি সাইকেল অপেরার সংগীতগুলি
শুনতেন। অন্ধকার ভবিষ্যতের সঙ্গে এই বিষাদ ঘন সংগীত মূর্ছনা তাঁকে
অতীন্দ্রিয়লোকে নিয়ে যেত। এই অদূর মৃত্যু আশঙ্কা তাঁকে এক অন্যভাবালোকে
নিয়ে যায়। জীবন সম্বন্ধে নুতন ভাবনা জাগে। বিগত অতীত বা অনাগত ভবিষ্যতের
চেয়ে ঘটমান বর্তমানটা যে অনেক বাস্তব, অনেক প্রাসঙ্গিক -তা উপলদ্ধি করলেন।
বেঁচে থাকাটা যে কত কাজের, কত মহিমান্বিত -সে ধারণা জন্মে। মনে মনে উঠে
দাঁড়ালেন হকিং, জোর কদমে শুরু করলেন গবেষণার কাজ।
ইতিমধ্যে পরিচয় হল জেন ওয়াইল্ড নামের একটি মেয়ের সঙ্গে। জেন মধ্যযুগীয়
ভাষার গবেষক। হতাশা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য জেন সবসময় উৎসাহ দিতে থাকে। ১৯৬৫
সালের জুলাই মাসে জেনের সঙ্গে ঘর বাঁধে হকিং। তারপরের বছর কেমব্রিজ থেকে
পি এইচ ডি পান। এর এক বছর পরেই জন্ম হয় পুত্র রর্বাট-এর।
১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বৃহৎমাণ মহাবিশ্ব। ব্যাপারটি
বোঝার জন্য একটু আগে থেকে শুরু করা যাক। ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিদ এডুইন পি
হাবল একটি মজার বিষয় লক্ষ্য করেন। তিনি দেখলেন রাতের আকাশের বুকে জেগে থাকা
জ্যোতিষ্কগুলি একই জায়গায় স্থির না। এরা একে অপরের থেকে প্রচন্ড বেগে
তফাতে ছুটে যাচ্ছে এবং যত দূর যাচ্ছে ততই বাড়ছে তাদের উড়ানের গতি। এই ছোটা
চলছে বহু বছর ধরে। হাবলের এই গবেষণার ফল বিজ্ঞানীমহলে হইচই ফেলে দিল। শুরু
হল উলটো গণনা। অর্থাৎ এখন যদি তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, তবে
সদূর অতীতে সমস্ত জ্যোতিষ্ক, তারকাপুঞ্জ এক জায়গায় জোট বেঁধে ছিল,
বিশ্বলোক ছিল অতিমাত্রায় সংকুচিত অবস্থায়।
মহাবিশ্বের এই ক্রমপ্রসারণকে বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাবেজর্জস
লেমেত্র ব্যাখ্যা করলেন ‘বিগ ব্যাং থিয়োরির’-সাহায্যে। তিনি বললেন- 'হাজার
কোটি বছর আগে বিশ্বব্রহ্মান্ড ছিল অতিসংকুচিত অবস্থায়। তার প্রসারণ শুরু
হয় আদি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এই বিস্ফোরণ অতিঘন গোলকটিকে ভেঙ্গে ফেলে।
টুকরো টুকরো করে মহাকাশে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে এগুলি প্রতি সেকেন্ডে কয়েক
হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে মহাশূন্যে। এই টুকরো টুকরো গতিশীল বস্তু
থেকেই নীহারিকাপুঞ্জ, গ্রহ, উপগ্রহ প্রভৃতির সৃষ্টি।'
বিগ ব্যাং তত্ত্বের পর বহু প্রশ্ন সামনে উঠে এল। যখন নীহারিকাগুলি
পরস্পরের উপর চাপানো তখন মহাবিশ্বের ঘনত্ব কি অসীম ছিল? নাকি অতীতে আর এক
সংকোচন দশা ছিল যখন নীহারিকারা পরস্পরের আঘাত করা এড়াতে পেরেছিল? হয়তো তারা
পরস্পরের পাশ কাটিয়ে আবার পরস্পর থেকে দূরে অপসরণ শুরু করেছিল? এইসব গাদা
গাদা প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে নতুন গাণিতিক সাধনীর প্রয়োজন হয়। ১৯৬৫ থেকে
১৯৭০ সাল পর্যন্ত হকিং সেই গণিতকে বিকশিত করে। এ কাজে সঙ্গী ছিল রজার
পেনরোজ। পেনরোজ তখন ছিলেন বার্কবেক কলেজে। পরে অক্সফোর্ড আসেন।
হকিং-এর অন্যতম গবেষণার বিষয় হল ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণবিবর। আমাদের এই
মহাবিশ্বে গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, উল্কা যে সব মহাজাগতিক বস্তুর কথা জানা
গেছে, তাদেরই একটি হল কৃষ্ণবিবর। কিন্তু গঠন ও চরিত্রে ব্ল্যাকহোল সবার
চেয়ে আলাদা। বিশ্বসৃষ্টির রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা যেসব অদ্ভুত জটিল
অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছেন কৃষ্ণবিবর তার মধ্যে চমকপ্রদ। কল্পনা করা যেতে
পারে যে, মহাকাশে একটি অন্ধকার গহ্বর মুখ হাঁ করে রয়েছে। এর প্রচন্ড টানে
মহাজাগতিক গ্যাসীয় অণু-পরমাণু বা বস্তুকণা ভীমবেগে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
এবং তার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। শুধু বস্তুকণা কেন, একটি গোটা নক্ষত্রকে
নিমেষের মধ্যে গ্রাস করার ক্ষমতা রাখে। এর আকর্ষণ বল এমন বেশি যে তার থেকে
আলো বেরিয়ে আসতে পারে না। আলোক বিকিরণ করে না বলে প্রিন্সটন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী হুইলার এদের নাম দিয়েছেন ব্ল্যাক হোল।
সালটা ১৯৭০। কয়েকদিন আগে জন্ম হয়েছে তার কন্যা লুসির। মনের মাঝে নতুন
আশা-নতুন আনন্দ। মেয়েরা যে বাপ সোহাগি এ ধারা বোধ হয় দেশকালের সীমানা মানে
না। সে দিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে স্টিফেন কৃষ্ণবিবরের কথা ভাবছিলেন। তিনি
বুঝতে পারলেন তার ও পেনরোজের আবিষ্কৃত গাণিতিক তত্ত্ব কৃষ্ণবিবরের ক্ষেত্রে
প্রযোজ্য। সে রাতে তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়েছিলেন যে সারা রাত এপাশ ওপাশ
করেছেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত হকিং কাজ করেছেন কৃষ্ণবিবর নিয়ে। ১৯৭৪ সালে
তিনি আবিস্কার করেন কৃষ্ণবিবর সম্পূর্ণ কৃষ্ণ নয়, এই গহ্বর থেকে কণিকা ও
বিকিরণ বের হয়। আলো নেই ঠিকই তবে এখানকার বস্তুকণা গনগনে আগুনের মতো আচরণ
করে। ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ বিজ্ঞানী মহলে ‘হকিং রেডিয়েশন’ নামেই
পরিচিত।
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত স্টিফেন নিজে নিজে খেতে পারতেন, বিছানায় উঠতে ও
নামতে পারতেন। স্ত্রী তাঁকে অন্য কাজে সাহায্য করতেন। বাচ্চা দুটোর
দেখাশোনাও জেন-এর হাতে। তারপর ধীরে ধীরে হাত-পা-দেহ অসাড় হতে থাকে। ১৯৮৫
সালে হকিং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। তারপর কথা ক্রমেই জড়িয়ে আসে। খুব ঘনিষ্ঠ
লোকেরা ছাড়া তাঁর কথা কেউই তেমনভাবে বুঝতে পারত না। এ সবে দমলেন না এই
অক্লান্ত নায়ক। তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলি একজন সেক্রেটারিকে বলে
দিতেন, সে তা লিখে দিত। আলোচনায় প্রিয়জনেরা দোভাষীর কাজ করত। এরপর তাঁর
শ্বাসনালীতে ট্রাকিওস্টমি অপারেশন হয়। এই অপারেশনে নীরব হয়ে যান বিশ্বজলসার
কথাশিল্পী। হাত-পা অসাড় সঙ্গে বাকরুদ্ধ। অবস্থাটা মনে মনে কল্পনা করুন।
হার মানলেন না অদম্য মানুষটি। একটার পর একটা বোর্ডে লেখা অক্ষর তাঁকে
দেখানো হতো। অক্ষরটি সঠিক হলে তিনি ভ্রু তুলে সম্মতি জানাতেন। এইভাবে তৈরি
হতো শব্দ-বাক্য, তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ।
ইতিমধ্যে উন্নতি ঘটেছে কম্পিউটার বিজ্ঞানের। ক্যালিফোর্নিয়ার এক
কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ওয়াল্ট ওলটোজ ইকোয়ালাইজার নামে এক কম্পিউটার প্রোগ্রাম
বানিয়েছিলেন। তিনি হকিং-এর দুরবস্থার কথা শুনে তা পাঠিয়ে দেন হকিং-এর কাছে।
যন্ত্রটা মাথা কিংবা চোখ নাড়িয়ে ব্যবহার করা যেত। ইকোয়ালাইজার চলত ডেস্ক
টপ কম্পিউটারের সাহায্যে। এরপর কেমব্রিজ অ্যাডপ্টিভ কমিউনিকেশন-এর ডেভিড
মেসন হকিং-এর হুইল চেয়ারে একটি পারসোনাল কম্পিউটার ও একটি স্পিস
সিন্থেসাইজার লাগিয়ে দেন। বর্তমানে পুরো দেহ অসাড়। বাঁ-হাতের দুটো আঙ্গুল
শুধু নাড়াতে পারেন। সেই আঙ্গুল দুটি দিয়ে কম্পিউটার কী-বোর্ড টিপে বাক্য
রচনা করেন। তাঁর বক্তব্য স্পিস সিন্থেসাইজারে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরে
রূপান্তরিত হয়ে শ্রোতাদের প্রাণে তুফান তোলে।
শুধু দুরূহ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ হয়। বহু সভায় তিনি সাধারণ মানুষের জন্য
পপুলার সায়েন্স বক্তৃতা দিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় তাঁর
দুনিয়া কাঁপানো বই 'কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস'(এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম)।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সর্বাধিক বিক্রিত পুস্তকের তালিকায় বইটি ছিল লাগাতার
তিপ্পান্ন সপ্তাহ। লন্ডনের ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ ২০৫ সপ্তাহ ধরে সর্বাধিক
বিক্রিত বলে উল্লেখিত হয়েছে। এ কারণে গিনেস বুক অফ রেকর্ডস’-এ নথিভুক্ত
হয়েছে ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’। সারা বিশ্বজুড়ে চল্লিশটির বেশি ভাষায়
অনুবাদ হয়েছে বইটির। সাধারণ মানুষের জন্য লেখা এইটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে
বেশি জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই। স্যার হকিং তাঁর এই বই সম্বন্ধে মন্তব্য করতে
গিয়ে বলেছেন-'মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোধ কতদূর এগিয়েছে সে সম্পর্কে আমার
নিজের বোধকে ব্যাখ্যা করার ইচ্ছা। অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি রহস্য
যে মানুষ অনেকটাই বুঝতে পেরেছে তা সাধারণ মানুষের গোচরে আনা।'
১৯৮৮ সালে 'দি ইনডিপেন্ডেন্ট' পত্রিকায় প্রকাশিত হকিং-এর
স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ১৯৮২ সালে মেয়ের পড়ার খরচ জোগার
করার জন্য এই বই লেখার শুরু। সে যাই হোক, ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’-এর
সাফল্যের চাবিটা আসলে অন্য জায়গায়। জটিল বিজ্ঞানের তত্ত্বে ঠাসা এই বইটি
প্রায় গাণিতিক সমীকরণ বর্জিত। বিজ্ঞান জানতে গিয়ে পাঠককে কখনোই অঙ্ক শেখার
ঝামেলায় পড়তে হয়নি। বিজ্ঞানকে এমন সহজ ও রসালো করে পরিবেশন করার জন্য
যতখানি জ্ঞান ও মুনশিয়ানা প্রয়োজন হকিং-এর মগজে তা প্রয়োজনাতিরিক্ত।
শুধু কি বিজ্ঞান ? না; শিল্প, সাহিত্য, সংগীত সবক্ষেত্রেই অবাধ বিচরণ
এই আপাত প্রতিবন্ধী মানুষটির। 'ডেসার্ট আইল্যান্ড রেকর্ড' ১৯৪২ সালে
ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন তাদের এই বেতার অনুষ্ঠান শুরু করে। পৃথিবীর
রেডিয়ো সেন্টারগুলির মধ্যে এটাই সবচাইতে দীর্ঘস্থায়ী অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে
অতিথিকে কল্পনা করতে বলা হয় যেন তাঁকে একটি মরুদ্বীপে একাকী ফেলে রাখা
হয়েছে, উদ্ধার না করা পর্যন্ত সময় কাটানোর জন্য আটখানি সংগীতের রেকর্ড বেছে
নিতে। হকিং-এর অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছিল ১৯৯২ সালের বড়োদিনে। সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলেন বিবিসি-র বিখ্যাত অ্যাঙ্কার স্যু ল্যলি। স্টিফেন উল্লেখ
করেছিলেন, পুলেঙ্ক-এর গ্লোরিয়া, ব্রাম-এর ভায়োলিন কনসার্টো, দ্য ভালকিরি,
মোর্জাট-এর রেকুইম আরো কিছু পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের কথা। শুধু সংগীতের
উল্লেখ নয়। এগুলির প্রেক্ষাপট, ভালো লাগার কারণ, সুর মূর্ছনার গভীরতা,
নোটেশন অনবদ্যভাবে ব্যাখ্যা করেন। সাধারণভাবে অনুষ্ঠানটি ৪০ মিনিটের হয়।
কিন্তু হকিং-এর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এই সময়সীমা নির্দিষ্ট ছিল না।
স্টিফেন তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন- "সত্যই আমি আগের চাইতে সুখী। অসুখ
করার আগে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে মৃত্যুর আশঙ্কার
ফলে আমি বুঝতে পারলাম বেঁচে থাকার মূল্য অনেক। করার মতো কাজ আছে। যে কোন
লোকই কত কাজ করতে পারে।"
চিকিৎসকেরা যে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন তার চাইতেও চল্লিশ বছর বেশি বেঁচে
রয়েছেন। বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত একটি বইয়ের লেখক হয়েছেন। স্থান-কাল
সম্বন্ধে বহু যুগের এক বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসকে তিনি উলটে দিয়েছেন। তাঁর মোটর
নিউরন ডিজিজ সন্বন্ধে এক সাংবাদিক তাঁকে একবার তির্যক প্রশ্ন করেছিল।
প্রত্যুত্তরে স্টিফেন বলেছিলেন- "এ ব্যাধি কারো কোনো সুবিধা করতে পারে না।
তবে অন্যলোকের যতটা অসুবিধা হয় আমার ততটা হয়নি। তার কারণ, আমি যা করতে
চেয়েছিলাম স্বয়ং যমরাজ ছাড়া আর কারো সাধ্য ছিল না তা বন্ধ করার। আমি চেষ্টা
করেছিলাম মহাবিশ্বের কাজ-কারবার কিছুটা হলেও বোঝার।" হ্যাঁ, দাম্ভিকতা
তাঁকেই মানায়। কারণ বক্তা এখানে স্টিফেন হকিং। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা
সত্ত্বেও মাত্র ৩২ বছর বয়সে লন্ডন রয়েল সোসাইটির ফেলো মনোনীত হয়েছেন। আর ৩৭
বছরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান অধ্যাপক। অর্থাৎ অতীতে যে
সিংহাসন অলংকৃত করেছিলেন প্রবাদ প্রতিম বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন,
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম গুরু নোবেলজয়ী গণিতজ্ঞ পল অ্যাড্রিয়েন ডিরাক।
হিমালয় প্রমাণ প্রতিবন্ধকতা তাঁর ইচ্ছাশক্তির স্টিমরোলারের সামনে বারবার
মসৃণ সমতলে পরিণত হয়েছে।
দুরারোগ্য এ.এল.এস ব্যাধি দেহটাকে স্থবির করে দিলেও তাঁর রসিক মনে টোল
ফেলতে পারেনি। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাঁর উচ্চমানের কৌতুক বারবার
শ্রোতাদের আমোদিত করেছে। আসলে বুদ্ধিদীপ্ততার সঙ্গে রসবোধের সম্পর্কটাই
নিবিড়। মনোবিজ্ঞানীরা অনেকেই এখন বলতে শুরু করেছেন গোমড়ামুখো-বেরসিকেরা
কখনই বুদ্ধিমান হতে পারেন না। ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ বইটির কৃতজ্ঞতা
স্বীকারের পাতাটি পড়লেই বোঝা যায়- "আমার এ বইটির সম্পাদক পিটার গাজার্ডি।
যে সব বিষয় ভালো করে ব্যাখ্যা করা হয়নি বলে তিনি ভেবেছিলেন, সেগুলি
সম্পর্কে তিনি পাতার পর পাতা মন্তব্য আর প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। যে সব জিনিস
পালটাতে হবে, তার ওই বিরাট তালিকা পেয়ে আমি রীতিমতো বিরক্ত হয়েছিলাম। আমার
উঁচু নাকটা মাটিতে ঘষে দেওয়ার পর বইটি এখন কেমন হয়েছে তা আপনারা বিচার
করুন।"
অসীম ব্রহ্মান্ডের গূঢ় রহস্য একদিকে যেমন হকিং-এর বলাকা মনকে আঙ্কিক
সমীকরণের বেড়াজালে বেঁধেছে, অন্যদিকে মানবসভ্যতার ভালো-মন্দ তাঁকে ক্ষণে
ক্ষণে চিন্তিত করেছে। মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ-বিগ্রহ, আগ্রাসন এসবের
বিরুদ্ধে বারবার সোচ্চার হয়েছেন স্টিফেন। ১৯৯৮ সালে প্রিন্স অফ আসটুরিয়াস
হারমনি প্রাইজ পাওয়ার পর তিনি বলেন- "সব দেশের জনসাধারণের উচিত অস্ত্রখাতে
ব্যয় কমানোর জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ
দূর করা যদি সম্ভব নাও হয়, তবুও অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আমরা বিপদ কিছুটা
কমাতে পারি। একটা বদ রসকিতা আছে, অন্য গ্রহের কোনো সভ্যতা আমাদের সঙ্গে
যোগাযোগ করতে পারেনি তার কারণ আমাদের স্তরে পৌঁছে তারা আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে
ওঠে। কিন্তু জনসাধারণের সদিচ্ছার উপর আমার যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। হয়তো এই বদ
রসিকতা আমরা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারব।"
এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনি পৌঁছে যান তাঁর কথা শোনাতে। ১৯৯৯ সালে
ভারতে এসেছিলেন। দিল্লির এক হোটেলের সেমিনার হলে বক্তৃতা দেন। ভারত ছাড়াও
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পার্শ্ববর্তী দেশগুলি থেকে ছাত্র, গবেষক,
অনুরাগী, সাংবাদিকরা ভিড় করেছিলেন হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে; একটি
প্রবেশপত্রের জন্য। প্রবেশপত্রের চাহিদা দেখে রিসেপশনিস্ট ভেবেছিল মাইকেল
জ্যাকশন বা ম্যাডোনা জাতীয় কেউ বোধহয় আসছেন। ভায়রার কাছে কেতা নেবার জন্য
রিসেপশনিস্টবাবুটি আগেভাগেই সরিয়ে রেখেছিলেন তিনখানি প্রবেশপত্র। ভুল
ভাঙ্গল একটি আবেদন দেখে- "আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই। তবে একজন সাধারণ
জ্ঞানপিপাসু হিসেবে এই সভায় প্রবেশ করতে আগ্রহী।" নীচে স্বাক্ষরকারীর নাম -
কে. আর. নারায়ণ। বুঝে গেলেন, ইনি আর যাই হন- ম্যাডোনা বা মাইকেল জ্যাকশন
নন। মহামহিম রাষ্ট্রপতি তাঁকে অভিহিত করেছেন 'হিউম্যান তাজ' বলে। তবে যাঁরা
কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা বলেন- "হকিং-এর কাজ-কারবার তাজমহলের চেয়েও
মনোমুগ্ধকর।"
স্টিফেন তাই শুধু বিজ্ঞানী নন। হকিং-এর পরিচয় এক কথায় দিতে গেলে
হোঁচট খেতে হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানী, সংগীত সমালোচক, যুদ্ধ বিরোধী শান্তিকামী
ব্যক্তিত্ব, জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক...। হ্যাঁ তিনি একাই বহুবচন। অন্যভাবে
বলতে গেলে বলা যায়, তিনি আমাদের জীবনের ধ্রুবতারা। আমাদের অনেকেরই তিনটি
হাত। ডান হাত, বাম হাত আর অজুহাত। পড়া না পরার অজুহাত, ফেল করার অজুহাত,
নেতাদের রয়েছে প্রতিশ্রুতি পালন না করার অজুহাত। এত সব অজুহাতের ভারে
নরদেবতার দেহমন যখন ভরাক্রান্ত, তখন এই ধরিত্রীকে এক চলতে না পারা, বলতে না
পারা মানুষ স্পিচ সিন্থেসাইজারের বোতাম টিপে টিপে জানিয়েছেন- "I have so
many many things to do. আমার অনেক অনেক কিছু করার আছে।”
No comments