“দেশে দেশে আগ্নেয়গিরি”
“দেশে দেশে আগ্নেয়গিরি” ডাঃ পার্থপ্রতিম। ৭ম বর্ষ ২৩৬ সংখ্যা শনিবার ১৭ শ্রাবন ১৩৯৮; বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত
অনেক বছর ঘুমিয়ে থাকার পর আবার একে একে জেগে উঠেছে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিগুলি, শুরু হয়েছে তাদের অগ্ন্যুৎপাত। গত ৩০ এপ্রিল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আন্দামানের ব্যারেন দ্বীপপুঞ্জের আগ্নেয়গিরি। জ্বালামুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসে ছোট বড় পাথর, গ্যাস। ৭ জুন রাত ১১টা নাগাদ ফিলিপিন্সের পিনাটুবো পাহাড়ের ধারেকাছের গ্রামগুলিতে হঠাৎ বেজে ওঠে বিপদসংকেত। নির্দেশ আসে গ্রাম ছেড়ে পাহাড় থেকে দূরবর্তী কোন স্থানে আশ্রয় নেবার। এখানেই শেষ নয়; এর সাতদিনের মধ্যেই জাপানের সবচেয়ে বিপজ্জনক আগ্নেয়গিরি মাউন্ট উনজেন থেকে শুরু হয় বিস্ফোরণ। লাভার স্রোতে শুকিয়ে খটখটে হযে যায় পাদদেশে বয়ে যাওয়া এক খরস্রোতা নদী।
ভূবিজ্ঞানীরা অগ্নুৎপাতের নিরিখে আগ্নেয়গিরিগুলি প্রধান তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। যে সব আগ্নেয়গিরি হতে কোনকালেই অগ্ন্যৎপাতের সম্ভাবনা নেই তারা হল মৃত, এক্সটিঙ্কট আগ্নেয়গিরি। ব্রহ্মদেশের পোপো এমনই একটি মৃত আগ্নেয়গিরি। যারা এখন চুপচাপ থাকলেও ভবিষ্যতে যে কোন সময় জেগে ওঠে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে তাদের বলা হয় সুপ্ত বা ডরমেন্ট। যে আগ্নেয়গিরি থেকে এখন অগ্নুৎপাত হচ্ছে সেগুলি জীবন্ত বা অ্যাকটিভ। পিনাটুবোর জ্বালামুখ দিয়ে অনবরত বেরিয়ে আসছে উত্তপ্ত লাভা তাই এর নাম হযেছে জীবন্ত অবিরাম আগ্নেয়গিরি। ইতালির স্টোম্বলি আগ্নেয় পাহাড় থেকে কিছুদিন পরপর অগ্ন্যৎপাত ঘটে সে কারণে একে বলে সবিরাম বা ইন্টারমিটেন্ট জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
জীবন্ত, সুপ্ত ও মৃত সব মিলিয়ে পৃথিবীতে মোট ৬৩২টি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এগুলির মধ্যে ২৪৩ টি বর্তমানে মৃত। জীবন্ত ও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির অধিকাংশই দু’টি প্রধান আগ্নেয় পর্বতমালায় অবস্থিত। একটি পর্বতমালা দক্ষিণ আমেরিকার হর্ন অন্তরীপ হতে শুরু হয়ে আন্দিজপর্বত, মধ্য ও উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতের মধ্যে দিয়ে উত্তর গোলার্ধের দিকে চলে গেছে। তারপর অ্যালুসিয়ান, কামচাটকা, জাপান ও ফিলিপিন্সের দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে পশ্চিমে বেঁকে শেষ হয়েছে সর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে। এরই একটি শাখা নিউগিনি হয়ে এসেছে নিউজিল্যান্ডে। এই আগ্নেয়পর্বতমালা প্রশান্তমহাসাগরকে ওড়নার মত ঘিরে রেখেছে তাই একে বলে ফায়্যারি রিং অফ দি প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় ওড়ানা।
দ্বিতীয় আগ্নেয়পর্বতমালাটি শুরু হয়েছে উত্তর মহাসাগরের আইসল্যান্ড দ্বীপ থেকে, তারপর দক্ষিণ অ্যাজোরস ও কোপভার্ড দ্বীপ হয়ে গিনি উপসাগরে পৌঁছে গেছে। এর একটি শাখা ভূমধ্যসাগরের মাঝখান দিয়ে চলে এসেছে মধ্য এশিয়ায়।
প্রশান্ত মহাসাগরের কুখ্যাত অঞ্চলে রয়েছে ১১৪টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এখানে বছরের সবসময়ে কোনও না কোনটি থেকে অগ্নুৎপাত হয়। ফুজিয়ামা বা ফুজি-শান জাপানের সবচেয়ে বড় আগ্নেয় পাহাড়। এটি ১৭০৭ সালে শেষবারের মতো লাভা-আগুন ছড়িয়ে ছিল। ফিলিপিন্সের আগ্নেয় পাহাড়গুলি হালমাহিরা, সেলবিস হয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গেছে। দেশের দক্ষিণ লুজনের মায়েন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ জাপানের ফুজিশানের চেয়েও বড়সড়।
প্রশান্ত মহাসাগরের আগ্নেয় ওড়নায় পূর্বকিনারায় আন্দিজ পর্বতের দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলে ৮টি এবং উত্তরভাগে ইকুয়েডরে ৬ টি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আন্দিজ পর্বতমালার সবচেয়ে উচুশৃঙ্গ আকানকাগুয়া একটি জ্বালামুখ। মধ্য আমেরিকার সমুদ্র উপকূলে প্রায় ১০ টি জীবন্ত আগ্নেয় পাহাড় আছে। মেস্কিকোর ৫৪৭২ মিটার উঁচু আগ্নেয়গিরি পোপোক্যটিপেটল এখন ঘুমিয়ে থাকলেও ভূবিজ্ঞানীরা মনে করছেন এটি যে কোনও সময় সক্রিয় হতে পারে।
এসব ছাড়াও পূর্ব আফ্রিকার গ্রস্ত উপত্যকায় ও পশ্চিমভারতীয় দ্বীপপুঞ্জগুলিতে রয়েছে অনেক আগ্নেয়গিরি। হাওয়াই দ্বীপের মৌনালোয়া পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু, যার পাদদেশ থেকে শিখরের উচ্চতা ৯,০০০ মিটার। ভারতের মূল ভূখন্ডে সুপ্ত অগ্নেয়গিরি নেই বললেই চলে, তবে ব্যারেন দ্বীপে দু’টি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে।
পৃথিবীর এই সুপ্ত আগ্নেয় পাহাড়গুলি কখন যে জীবন্ত হয়ে গলিত পাথর, গ্যাস, ছাই মাটিতে ছড়াতে শুরু করবে তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারেন না। যে মানুষ সর্বদা প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব করতে ব্যস্ত; হঠাৎই সে পরিণত হবে প্রকৃতির দাসে।





No comments